একসময় সুস্থ-সবল পায়ে দৌড়ে স্কুলে যেতেন জাহিদ হাসান। বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা, পড়াশোনা আর ভবিষ্যৎ নিয়ে রঙিন স্বপ্ন দেখতেন। কিন্তু সামান্য একটি জ্বর ও ভুল চিকিৎসার নির্মম পরিণতি ওলটপালট করে দিয়েছে এই মেধাবী তরুণের পুরো জীবন। কোমরের নিচ থেকে অবশ হয়ে গেলেও স্বপ্ন দেখার সাহস হারাননি জাহিদ। বিছানায় শুয়ে শুয়েই কম্পিউটারের জটিল সব কোডিং ব্যবহার করে বর্তমানে একজন সফল ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে ফ্রিল্যান্সিং করছেন তিনি।
সুনামগঞ্জ শহরতলির মাইজবাড়ি এলাকার দরিদ্র কৃষক জাকির আহমদ ও গৃহিণী কুসবুল বেগমের বড় ছেলে জাহিদ হাসান। তিনি পড়াশোনা করতেন ঐতিহ্যবাহী সুনামগঞ্জ সরকারি জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয়ে।
একটি ভুল চিকিৎসা ও বদলে যাওয়া জীবন
২০১৫ সালে অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় সাধারণ জ্বরে আক্রান্ত হন জাহিদ। দ্রুত সুস্থতার আশায় পরিবারের লোকজন স্থানীয় এক হাতুড়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন। সেই চিকিৎসাই তাঁর জীবনে কাল হয়ে দাঁড়ায়। অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ও সাপোজিটরি ব্যবহারের পর জাহিদের শরীরে তীব্র খিঁচুনি শুরু হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে প্রথমে সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতাল এবং পরে সিলেটে পাঠানো হলেও ততক্ষণে গলা থেকে নিচ পর্যন্ত অবশ হয়ে পড়ে তাঁর শরীর।
এরপর শুরু হয় এক দীর্ঘ ও নির্মম সংগ্রাম। সিলেট, ঢাকা ও ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে টানা দুই বছর চিকিৎসা চললেও পুরোপুরি সুস্থ হতে পারেননি জাহিদ।
অদম্য জাহিদের বিস্ময়কর সাফল্য
শারীরিক অক্ষমতা জাহিদের ইস্পাতকঠিন মনোবল ভাঙতে পারেনি। বিছানায় শুয়েই তিনি ফের বই হাতে তুলে নেন। দুই বছর বিরতির পর ২০১৭ সালে মাত্র ১৫ দিন পড়াশোনা করে জেএসসি পরীক্ষায় ৪.৪৩ পয়েন্ট অর্জন করেন। এরপর ২০২০ সালে এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ এবং ২০২২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় ৪.৬৭ পয়েন্ট পেয়ে সবাইকে চমকে দেন।
সাফল্যের ধারা বজায় রেখে জাহিদ হাসান পরবর্তী সময়ে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়—উভয় জায়গাতেই ভর্তির সুযোগ পান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি হয়ে ক্লাসও শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে শারীরিক জটিলতা বেড়ে যাওয়ায় মাত্র তিন মাস পর ঢাকা ছেড়ে তাঁকে সুনামগঞ্জে ফিরে আসতে হয়।
জাহিদ বলেন, “আমার শারীরিক অবস্থার কারণে সার্বক্ষণিক একজন মানুষের সহযোগিতা প্রয়োজন হয়। আমার মা ছাড়া দেখাশোনা করার মতো আর কেউ নেই। হোস্টেল বা মেসে থাকা অসম্ভব হওয়ায় বাধ্য হয়ে ঢাবির পড়াশোনা ছেড়ে বাড়িতে ফিরে আসতে হয়েছে।”
বিছানায় শুয়েই কোডিং ও প্রতারণার শিকার
বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়লেও হার মানেননি জাহিদ। বিছানায় শুয়েই নিজের ল্যাপটপে কোডিং শিখে আন্তর্জাতিক বাজারে ওয়েব ডেভেলপার হিসেবে কাজ শুরু করেন। তবে এখানেও তাঁকে লড়াই করতে হচ্ছে অসাধু মানুষদের সাথে। আবেগঘন কণ্ঠে জাহিদ বলেন, “আমার অসুস্থতার সুযোগ নিয়ে অনেক ক্লায়েন্ট কাজ শেষ করে নেওয়ার পরও টাকা না দিয়ে ব্লক করে দেয়। এখন আমার একটাই ইচ্ছা, সুস্থ হয়ে আবার স্বাভাবিক জীবনে ফেরা। নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে আমার মতো অসহায় ও শারীরিক অক্ষম মানুষদের পাশে দাঁড়াতে চাই।”
চিকিৎসার জন্য প্রয়োজন ১ কোটি টাকা: আকুল আবেদন মায়ের
জাহিদের পরিবার জানায়, চিকিৎসকরা জানিয়েছেন উন্নত চিকিৎসার জন্য জাহিদকে দেশের বাইরে বিশেষায়িত হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাঁর সুস্থ হওয়া সম্ভব। তবে দীর্ঘ ১১ বছরের চিকিৎসায় পরিবারটি এখন পুরোপুরি সর্বস্বান্ত।
জাহিদের মা কুসবুল বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ছেলেকে সুস্থ করতে জমিজমা, ঘরবাড়ি, গরু-বাছুর যা ছিল সবই বিক্রি করেছি। মানুষের সহযোগিতা ও ঋণ নিয়ে এতদিন চিকিৎসা চালিয়েছি। ডাক্তাররা বলেছেন জাহিদকে পুরোপুরি সুস্থ করতে আরও উন্নত চিকিৎসার প্রয়োজন, যার জন্য প্রায় এক কোটি টাকা লাগবে। আমাদের পক্ষে এই টাকা জোগাড় করা অসম্ভব। দেশের সামর্থ্যবান মানুষ ও সরকার একটু এগিয়ে এলে হয়তো আমার ছেলেটা আবার নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারত।”
(কোনো সহৃদয় ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অদম্য এই মেধাবী তরুণের চিকিৎসায় পাশে দাঁড়াতে চাইলে তাঁর পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন।)
অনুরূপ সংবাদ
অনলাইন জুয়ার জেরে সাতক্ষীরায় ৫ মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে গলা কেটে হত্যা
বাগেরহাটে মামাতো ভাইয়ের ছুরিকাঘাতে যুবক খুন: অভিযুক্ত আটক
আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত নই: উম্মে কুলসুম পপি