ইরান ইস্যুতে ত্রিমুখী সংকটে ট্রাম্প প্রশাসন: ওয়াশিংটনে ‘কৌশলগত অচলাবস্থা’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফর এবং একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ায় ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির পর ইরান ইস্যু ওয়াশিংটনের জন্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও গভীর কৌশলগত সংকটে পরিণত হয়েছে। মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনে এখন এমন ইঙ্গিত স্পষ্ট, যাকে এক কথায় “কৌশলগত অচলাবস্থা” বলা যায়। মার্কিন প্রশাসনের এই নাজেহাল পরিস্থিতি এখন খোদ দেশটির অনেক কর্মকর্তা ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকও স্বীকার করতে শুরু করেছেন।
ইরানি সংবাদমাধ্যম মেহের নিউজের এক বিশেষ প্রতিবেদনে এই সংকটের বিস্তারিত চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ আমেরিকার জন্য বিপর্যয়: ক্রিস মারফি
মার্কিন গোয়েন্দা মূল্যায়ন অনুযায়ী, দীর্ঘদিন অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপ সত্ত্বেও ইরান এখনো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতার সিংহভাগ ধরে রেখেছে এবং আঞ্চলিক প্রতিরোধ ক্ষমতাও বজায় রেখেছে।
এই পরিস্থিতির ভয়াবহতা উল্লেখ করে কানেকটিকাটের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস মারফি সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ কোনো সাধারণ অচলাবস্থা হবে না, বরং এটি হবে “আমেরিকার জন্য একটি চরম বিপর্যয়।”
তিনটি বিকল্প এবং ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে যত ঝুঁকি:
বর্তমানে ইরান প্রশ্নে ট্রাম্প প্রশাসনের সামনে মূলত তিনটি বিকল্প খোলা রয়েছে, তবে প্রতিটি পথই চরম ঝুঁকিপূর্ণ:
-
১. সামরিক সংঘাত বা উত্তেজনা বাড়ানো: ইসরায়েলপন্থী লবির ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপের দিকে যেতে পারে। তবে গত দুই দশকের ব্যয়বহুল মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের তিক্ত অভিজ্ঞতা যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক অঙ্গনকে (বিশেষত ডেমোক্র্যাটদের) আরেকটি যুদ্ধের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে। ট্রাম্প সামরিক পদক্ষেপ নিলে তা দেশের অভ্যন্তরে তীব্র গণ-সমালোচনার মুখে পড়বে।
-
২. কূটনৈতিক সমঝোতা বা চুক্তি: মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তেহরানের সঙ্গে যেকোনো চুক্তি মানেই রিপাবলিকান পার্টির একটি বড় অংশ এবং ইসরায়েলঘনিষ্ঠ লবি নেটওয়ার্কের তীব্র ক্ষোভের মুখে পড়া। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তি (জেসিপিওএ) এর বড় উদাহরণ। এখন ট্রাম্প যদি সমঝোতার দিকে হাঁটেন, তবে বিরোধীরা সেটিকে মার্কিন প্রশাসনের ‘দুর্বলতা বা আত্মসমর্পণ’ হিসেবে প্রচার করার মোক্ষম সুযোগ পাবে।
-
৩. ইস্যুটিকে ঝুলিয়ে রাখা: কোনো চুক্তি বা সরাসরি সংঘাত—কোনোটাতেই না গিয়ে বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখাও মারাত্মক কৌশলগত ঝুঁকি বহন করছে। ওয়াশিংটনের বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকলে ইরান তার পরমাণু, সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা নতুনভাবে পুনর্মূল্যায়ন ও শক্তিশালী করার বাড়তি সুযোগ পেয়ে যাবে।
অভ্যন্তরীণ ঐকমত্য ও আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাব
ইরান প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্র বর্তমানে সবচেয়ে বেশি ভুগছে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ঐকমত্য এবং দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সমর্থনের অভাবে। ওয়াশিংটন যদি একতরফা সামরিক হামলার পথে এগোয়, তবে ইউরোপীয় মিত্রদের সমর্থন পাওয়ার কোনো নিশ্চয়তা নেই। কারণ ইউরোপ বরাবরই কূটনৈতিক সমাধানের পক্ষে।
আঞ্চলিক পর্যায়ে পারস্য উপসাগরীয় আরব দেশগুলোও বর্তমানে নতুন কোনো যুদ্ধের চেয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে বেশি মনোযোগী। ফলে তারা স্বয়ংক্রিয়ভাবে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন করবে না। অন্যদিকে, জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য চীন ও রাশিয়া এই ইস্যুতে পরিষ্কারভাবে ওয়াশিংটনের বিপক্ষে এবং তারা ইরান ইস্যুকে যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্য বিস্তারের হাতিয়ার হতে দিতে নারাজ।
সব মিলিয়ে, ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র এখন এমন এক গোলকধাঁধায় পৌঁছেছে যেখানে কোনো বিকল্পই সহজ নয়। এই আন্তর্জাতিক বিভাজন ও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য ওয়াশিংটনের কৌশলগত সংকটকে আরও ঘনীভূত করেছে। ফলে এটি স্পষ্ট যে, অতীতের একতরফা শক্তিপ্রয়োগের নীতির মাধ্যমে আর ইরান ইস্যু মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; এর জন্য মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির বাস্তবসম্মত পুনর্নির্ধারণ প্রয়োজন।
অনুরূপ সংবাদ
ইরান-লেবানন ও ফিলিস্তিনের প্রতি অবস্থান অবিচল রাখার ঘোষণা হুথি প্রধানের
মেয়েরা বিয়েতে চুপ থাকলেই ‘সম্মতি’, বাল্যবিয়ে নিয়ে তালেবানের নতুন পারিবারিক আইন
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন কৌশল, ফি আদায়ের ঘোষণায় ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ও হুঁশিয়ারি