নিউমুরিং টার্মিনাল বিদেশিদের হাতে গেলে অর্থনীতি-সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে: আনু মুহাম্মদ
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি কোনো কোম্পানির কাছে ইজারা দেওয়া হলে শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক, সামরিক ও সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও জড়িত হবে বলে মন্তব্য করেছেন অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ। তাঁর মতে, বন্দরের দক্ষতা বাড়াতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে দেশীয় সক্ষমতা উন্নয়নের দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।
মঙ্গলবার জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘চট্টগ্রাম বন্দর ও জাতীয় স্বার্থ’ শীর্ষক এক গোলটেবিল আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। মিডিয়া অ্যান্ড সিভিল রাইটস সোসাইটি (এমসিআরএস) এ আলোচনার আয়োজন করে।
বিদেশি নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপত্তি
আনু মুহাম্মদ বলেন, বিদেশি কোনো কোম্পানিকে চট্টগ্রাম বন্দরের টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি শুধু ব্যবসায়িক বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখলে হবে না। এর সঙ্গে রাজনৈতিক ও সামরিক বিষয়ও জড়িত।
তাঁর ভাষ্য, এনসিটির নিয়ন্ত্রণ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে গেলে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ওপর নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
‘দেশীয় সক্ষমতা বাড়াতে হবে’
বিদেশি কোম্পানি যুক্ত হলে বন্দরের সক্ষমতা বাড়বে—এমন যুক্তিরও সমালোচনা করেন আনু মুহাম্মদ। তিনি বলেন, সিঙ্গাপুর ও ভিয়েতনামের মতো দেশ নিজেদের জাতীয় সক্ষমতা গড়ে তুলেই বন্দর ব্যবস্থাপনায় উন্নতি করেছে।
তাঁর মতে, কাস্টমস, আমলাতন্ত্র ও অবকাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার পাশাপাশি বাংলাদেশের নিজস্ব দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে হবে।
এনসিটির সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন
গোলটেবিল আলোচনায় উপস্থাপিত একটি প্রবন্ধে বলা হয়, এনসিটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে নির্মিত। এতে সরকারের বিনিয়োগ প্রায় ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। সম্প্রতি আরও প্রায় ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ে টার্মিনালে ১৪টি কুই গ্যান্ট্রি ক্রেন ও ৩৩টি আরটিজি ক্রেন যুক্ত করা হয়েছে।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, দেশীয় ব্যবস্থাপনায় ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এনসিটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টিইইউ কনটেইনার হ্যান্ডলিং করেছে, যা জার্মান পরামর্শকের নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে প্রায় ২৬ শতাংশ বেশি।
৩০ বছরের চুক্তি নিয়ে প্রশ্ন
আলোচনায় প্রস্তাবিত চুক্তির মেয়াদ ও শর্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। ১৫ বছরের আর্থিক মডেল ধরে হিসাব প্রস্তুত করা হলেও এখন ৩০ বছরের পরিচালনা-স্বত্ব দেওয়ার দাবি কেন উঠছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলে আলোচনায় উঠে আসে।
এ ছাড়া চুক্তির শর্ত প্রকাশ না করা, একই অপারেটরকে একাধিক টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ দেওয়া এবং তথ্যের নিরাপত্তা ও সাইবার ঝুঁকি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির আহ্বান
আনু মুহাম্মদ সরকারের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বন্দর নিয়ে যেসব প্রশ্ন উঠছে, সেগুলোর বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার অনুযায়ী প্রতিরোধ গড়ে তোলারও আহ্বান জানান তিনি।
আলোচনায় সাত দফা প্রস্তাব
গোলটেবিল আলোচনায় কৌশলগত অবকাঠামো পরিচালনার ক্ষেত্রে উন্মুক্ত আন্তর্জাতিক দরপত্র, বিদেশি বিনিয়োগে দেশীয় অংশীদারের ৫১ শতাংশ মালিকানা এবং সর্বোচ্চ ১৫ বছরের চুক্তির প্রস্তাব করা হয়।
এ ছাড়া একই অপারেটরকে একাধিক কনটেইনার টার্মিনাল না দেওয়া, টার্মিনাল অপারেটিং সিস্টেম ও পরিচালন তথ্যের মালিকানা রাষ্ট্রের কাছে রাখা, চুক্তির খসড়া প্রকাশ এবং সংসদীয় কমিটিতে তা উপস্থাপনের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।