মৃত্যুর মুখে মাতৃত্বের জয়: বোমাবর্ষণের মধ্যেও ৩ নবজাতককে আগলে রাখা ইরানি নার্স নেদার গল্প
১ মার্চ সকাল ১১টা ৪০ মিনিট। তেহরানের খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতালের কাছে একটি সামরিক স্থাপনায় সাম্রাজ্যবাদী যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি বাহিনীর আকস্মিক বোমা হামলার বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা। বিস্ফোরণের তীব্র তরঙ্গে হাসপাতালের জানালার কাচগুলো শেলের টুকরোর মতো ভেতরে ছিটকে পড়ে, ছাদের অংশ ধসে সৃষ্টি হয় ধুলোর মেঘ। ধোঁয়ায় অন্ধ করিডোর দিয়ে যখন আতঙ্কিত রোগীরা চিৎকার করতে করতে ছুটছিলেন, ঠিক তখনই পঞ্চম তলার নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) তৈরি হচ্ছিল মানবতা ও সাহসিকতার এক অনন্য ইতিহাস।
বোমা হামলার ঠিক আগমুহূর্তে এনআইসিইউ-তে তিনটি সদ্যোজাত শিশু তাদের ছোট বিছানায় নিশ্চুপ শুয়ে ছিল। তাদের পাশে বসেই রিপোর্ট লিখছিলেন ৩৬ বছর বয়সী নবজাতক নার্স নেদা সালিমি। বিস্ফোরণের শব্দ শোনার পর নিজের প্রাণ বাঁচাতে দরজার দিকে না ছুটে, মাত্র তিন সেকেন্ডের মধ্যে নেদা ছুটে যান অবুঝ ও অসহায় প্রাণগুলোর দিকে।
পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া হাসপাতালের একটি নিরাপত্তা ক্যামেরার মাত্র সাত সেকেন্ডের ফুটেজে দেখা যায়, আংশিক ধসে পড়া ছাদের নিচ থেকে ধুলো আর ধ্বংসস্তূপের মধ্যে তিন নবজাতককে একসঙ্গে বুকে শক্ত করে আগলে ধরে দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছেন নেদা। এই সাত সেকেন্ডের দৃশ্যটিই রাতারাতি তাকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে বীরত্বের প্রতীকে পরিণত করে।
ধোঁয়া ও অন্ধকারের মাঝে তিন পুনর্মিলন
করিডোরে পৌঁছে নেদা দুই শিশুকে অন্য সহকর্মীদের হাতে তুলে দিয়ে তৃতীয় শিশুটিকে নিজের বুকে চেপে ধরে হাসপাতালের নিচতলার আশ্রয়কেন্দ্রের দিকে ছুটতে থাকেন। বিস্ফোরণের মাত্র এক ঘণ্টা আগে জন্ম নেওয়া ওই তিন শিশুর মায়েরা তখন অস্ত্রোপচার কক্ষে সেরে উঠছিলেন। তীব্র আতঙ্কের মধ্যে মায়েরা যখন ভাবছিলেন তাদের সন্তানরা হয়তো আর বেঁচে নেই, ঠিক তখনই ধোঁয়া আর অন্ধকারের দেয়াল ভেদ করে দেবদূতের মতো সন্তানদের নিয়ে হাজির হন নেদা।
নেদা সালিমি প্রেস টিভিকে বলেন, “যখন আমরা শেষ পর্যন্ত মায়েদের খুঁজে পেলাম এবং তাদের হাতে বাচ্চাগুলো ফিরিয়ে দিলাম, সেটাই ছিল সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্ত। সেদিন আমরা তিনটি অলৌকিক পুনর্মিলনের সাক্ষী হয়েছিলাম। কয়েক মুহূর্তের জন্য আমরা ভুলেই গিয়েছিলাম যে বাইরে যুদ্ধ চলছে।”
মাতৃত্ব ও পেশাদারিত্বের এক অনন্য মেলবন্ধন
ইরান ইউনিভার্সিটি অব মেডিকেল সায়েন্সেসে নার্সিংয়ে পিএইচডির শেষ সেমিস্টারের শিক্ষার্থী নেদার বাড়ি কেরমানশাহে। ১২ বছর ধরে নার্সিং পেশায় থাকা নেদা নিজেও ছয় বছর বয়সী এক সন্তানের মা। তিনি মনে করেন, নিজের মাতৃত্ববোধ শিশুদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধকে আরও গভীর করেছে।
এনআইসিইউ-র অভিজ্ঞতা শেয়ার করতে গিয়ে নেদা বলেন, “এখানে কাজ করতে হলে একই সঙ্গে দৃঢ় মানসিকতা আর খুব কোমল হৃদয় দরকার। এক মুহূর্তে আপনি একটি শিশুর মৃত্যুর শোক দেখতে পারেন, আবার দশ মিনিট পরই অন্য এক মাকে হাসিমুখে শিশুকে বুকের দুধ খাওানো শেখাতে হয়। মুহূর্তেই শোক থেকে আশায় ফিরে আসতে হয়।”
যুদ্ধের মাঠে বারবার পরীক্ষা
খাতাম আল-আনবিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাকর্মীদের জন্য এটিই প্রথম যুদ্ধক্ষেত্রের অভিজ্ঞতা নয়। এর আগে ২০২৫ সালের জুনে ১২ দিনের যুদ্ধের সময়ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্যে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে নবজাতকদের সরিয়ে নিয়েছিলেন নেদা ও তাঁর সহকর্মীরা। তবে এবারের মার্চের হামলাটি ছিল আরও অনেক বেশি ভয়াবহ ও ধ্বংসাত্মক।
হঠাৎ পাওয়া এই ব্যাপক প্রচারণার পরও নেদা সালিমি অত্যন্ত বিনয়ের সাথে জানান, এটি কোনো একক বীরত্বের ঘটনা ছিল না। সেদিন তাঁর সমস্ত সহকর্মীই সাহসিকতার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করেছিলেন। তবে এই ঘটনার পর থেকে উদ্ধারকৃত তিন শিশুর পরিবারের সাথে এখনও তাঁর যোগাযোগ রয়েছে এবং শিশুরা সবাই সুস্থ আছে বলে তিনি নিশ্চিত করেন।
প্রশংসা নয়, প্রয়োজন বাস্তব পরিবর্তন
কোভিড-১৯ মহামারি থেকে শুরু করে একের পর এক যুদ্ধ—সব পরিস্থিতিতেই ইরানি নার্সরা নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। তবে নেদা সালিমি মনে করেন, সংবাদ শিরোনাম মুছে যাওয়ার পরও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত কাজের চাপ, জনবল সংকট, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং যুদ্ধের মানসিক ক্ষত থেকে যায়। তাই বর্তমান সরকারের কাছে কেবল মৌখিক প্রশংসা নয়, বরং ভালো কর্মপরিবেশ ও পর্যাপ্ত পেশাগত সহায়তার দাবি জানান তিনি।
ভবিষ্যতের আশা ব্যক্ত করে এই সাহসী নার্স বলেন, “আমি চাই এই শিশুরা যখন বড় হয়ে তাদের জীবনের প্রথম ঘণ্টার অলৌকিক বেঁচে যাওয়ার গল্প শুনবে, তখন তারা যেন বুঝতে পারে জীবন একটি অলৌকিক বিষয়, যার জন্য দরকার দয়া, চেষ্টা আর বিশ্বাস। আমি চাই তারা বড় হয়ে শক্তিশালী এবং সহানুভূতিশীল মানুষ হোক।”
অনুরূপ সংবাদ
মেয়েরা বিয়েতে চুপ থাকলেই ‘সম্মতি’, বাল্যবিয়ে নিয়ে তালেবানের নতুন পারিবারিক আইন
হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচলে ইরানের নতুন কৌশল, ফি আদায়ের ঘোষণায় ট্রাম্পের নিষেধাজ্ঞা ও হুঁশিয়ারি
নতুন কোনো বোকামি করলে চূর্ণকারী আঘাতের মুখোমুখি হবে আমেরিকা: ইরান
দপ্তর বণ্টনে বিজয়ের কৌশল, মূল মন্ত্রণালয় নিজের নিয়ন্ত্রণে
সামান্য বৃষ্টিতে ভিজলেই সর্দি-জ্বর?
১০ ঘন্টা আগে
দুই দিনের সফরে ঢাকায় কাতারের শ্রমমন্ত্রী
১৪ ঘন্টা আগে
রেকর্ড দামের পর এবার কমল স্বর্ণের দাম
২২ ঘন্টা আগে
হামের সংকট নিয়ে যা জানালেন তাসনিম জারা
২ দিন আগে