ডাকসু সংগ্রহশালায় জিন্নাহর ছবি, বাদ পড়েছে বঙ্গবন্ধুর একক ছবি
সংস্কারের পর নতুন করে চালু হওয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সংগ্রহশালায় পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর তিনটি ছবি যুক্ত হয়েছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশের ইতিহাসের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলন-সংগ্রামের অংশ হিসেবে আগে থাকা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের একক ছবিগুলো আর রাখা হয়নি। এ নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন করে আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
রোববার সংগ্রহশালাটি নতুনভাবে উন্মুক্ত করার পর এসব পরিবর্তন দেখা যায়। সেখানে ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানসহ বিভিন্ন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ও ব্যক্তিদের ছবি স্থান পেয়েছে।
জিন্নাহর তিনটি ছবি
সংগ্রহশালায় রাখা জিন্নাহর তিনটি ছবির মধ্যে একটি ১৯৪৮ সালের ২১ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে তাঁর দেওয়া বক্তব্যের সময়কার ছবি। ওই বক্তব্যে তিনি উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার কথা বলেছিলেন।
অন্য একটি ছবি ১৯৪০ সালের লাহোরে নিখিল ভারত মুসলিম লীগের সম্মেলনের। তৃতীয়টি ১৯৭০ সালের নির্বাচন নিয়ে পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের কাটিং।
বঙ্গবন্ধুর একক ছবি নেই
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বর্তমানে ভাষা আন্দোলন, যুক্তফ্রন্ট নির্বাচন, ছয় দফা, আগরতলা মামলা, গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭০ সালের নির্বাচন ও মুক্তিযুদ্ধের অংশে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কোনো একক ছবি দেখা যায়নি।
তবে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ সালের সময়পর্বে বঙ্গবন্ধুর দুই ছেলের বিয়ের ছবি এবং তাঁর ছবি-সংবলিত কয়েকটি সংবাদপত্রের কাটিং রাখা হয়েছে। ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ এবং তৎকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়েও কিছু ছবি ও সংবাদকাটিং রাখা হয়েছে।
‘ফ্যাসিবাদের সব আইকনের ছবি সরানো হয়েছে’
সংগ্রহশালার সংস্কারের সঙ্গে যুক্ত ডাকসুর মুক্তিযুদ্ধ ও আন্দোলনবিষয়ক সম্পাদক ফাতিমা তাসনিম জুমা বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর ‘ফ্যাসিবাদের সব আইকনের’ ছবি সরিয়ে ফেলা হয়েছে। তাঁর দাবি, নতুন করে সংগ্রহশালা সাজানোর সময় বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিভিন্ন বিষয়ও যুক্ত করা হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ মার্চের ভাষণ, ছয় দফা আন্দোলন এবং মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডারদের বিষয়ও নতুনভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
জিন্নাহর ছবি রাখার বিষয়ে তিনি বলেন, ছবিগুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনার ক্যাপশন রয়েছে এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্কিত ঘটনা হিসেবে সেগুলো রাখা হয়েছে। জিন্নাহকে গৌরবান্বিত করার উদ্দেশ্যে ছবি রাখা হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন।
আরও অনেক ঐতিহাসিক ব্যক্তির ছবি
সংগ্রহশালায় এ কে ফজলুল হক, মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, এম এ জি ওসমানী, নবাব সলিমুল্লাহ, জিয়াউর রহমান ও খালেদা জিয়াসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির ছবি রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ২০১৩ সালের হেফাজত আন্দোলন, যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে শাহবাগ আন্দোলন, আবরার ফাহাদ ও সানি হত্যাকাণ্ড, ২০২০ সালের মোদিবিরোধী আন্দোলন এবং জুলাই অভ্যুত্থানের বিভিন্ন আলোকচিত্রও সংগ্রহশালায় স্থান পেয়েছে।
জিন্নাহর ছবি নিয়ে প্রতিবাদ
জিন্নাহর ছবি যুক্ত করার প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী তিনটি ছবি ছিঁড়ে ফেলেছেন। একই ঘটনায় ছাত্র ফেডারেশনের নেতা-কর্মীরা জিন্নাহর ছবি প্রদর্শনের প্রতিবাদ জানিয়ে জামায়াতের সাবেক আমির গোলাম আযমকে জুতাপেটা করার একটি ছবি সংগ্রহশালায় টাঙিয়ে দেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জিন্নাহর ছবি ছেঁড়া ও ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
সংগ্রহশালার নতুন উপস্থাপনা নিয়ে বিতর্কের পাশাপাশি ঐতিহাসিক ঘটনাগুলো কীভাবে সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করা হবে, সে প্রশ্নও সামনে এসেছে।