এনসিপির আলোচনা: বিএনপি ‘ডিজিটাল ফ্যাসিবাদ’ কায়েম করতে চায়
প্রস্তাবিত সাইবার সুরক্ষা আইন সংশোধনীর সমালোচনা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা অভিযোগ করেছেন, এর মাধ্যমে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংকুচিত এবং নাগরিকদের মধ্যে ভীতি তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। তাঁদের দাবি, অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকলে আইনটির অপব্যবহার করে সরকারবিরোধী মতের মানুষকে হয়রানি করা হতে পারে।
শনিবার দুপুরে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনী: বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের ভবিষ্যৎ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এসব বক্তব্য উঠে আসে। এনসিপির সংস্কার বাস্তবায়ন কমিটি এ সভার আয়োজন করে।
সংশোধনী নিয়ে আখতার হোসেনের উদ্বেগ
সভায় সমাপনী বক্তব্যে এনসিপির সদস্যসচিব ও সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপপ্রয়োগের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ প্রণয়ন করেছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল অনলাইন অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি নাগরিকদের অযাচিত গ্রেপ্তার ও হয়রানি সীমিত রাখা।
তবে বর্তমান সরকারের প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বিভিন্ন অপরাধের সংজ্ঞা অস্পষ্ট ও ব্যাপক করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর মতে, এর ফলে বাক্স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আখতার হোসেন আরও বলেন, সরকার-সমর্থকদের গালিগালাজ, গুজব ও মানহানিকর বক্তব্যের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া না হলেও সরকারের সমালোচকদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। এভাবে অস্পষ্ট আইনের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যেও ভীতি সৃষ্টি করা সম্ভব।
অপব্যবহারের সুযোগ দেখছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান
আলোচনায় অংশ নিয়ে এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কিছু বিষয় অস্পষ্ট রাখা হয়েছে, যা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, নিজের সুবিধামতো আইন তৈরি ও প্রয়োগ করে কোনো শাসকের পক্ষেই দীর্ঘদিন ক্ষমতা ধরে রাখা সম্ভব নয়।
তিনি আরও বলেন, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের উচিত এমন আইন প্রণয়ন করা, যাতে ভবিষ্যতে আইনটির অপপ্রয়োগের ঝুঁকি না থাকে।
সরকারের যুক্তি খণ্ডন করে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন
সাবেক গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস সভায় মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন। সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর পক্ষে সরকারের দেওয়া যুক্তি—উসকানি ঠেকানো, নারী ও শিশুদের হয়রানি প্রতিরোধ এবং অপতথ্য মোকাবিলা—নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি।
নাবিলা ইদ্রিসের মতে, এসব সমস্যার প্রতিকার বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই রয়েছে। তাই নতুন সংশোধনীর প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করতে সরকারের যুক্তি যথেষ্ট নয়।
তিনি বলেন, সাইবার অপরাধ প্রতিরোধে কার্যকর আইন প্রয়োজন, তবে অপরাধের স্পষ্ট সংজ্ঞা, স্বচ্ছ যাচাইপ্রক্রিয়া, স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারিক তদারকিও নিশ্চিত করতে হবে। সাংবাদিকদের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশকারী সাধারণ নাগরিকদের অধিকারও সমানভাবে সুরক্ষিত রাখা জরুরি।
কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ
‘ডেইলি ওয়াদা’র ব্যবস্থাপনা সম্পাদক ফয়সাল মাহমুদ বলেন, বিচারিক অনুমোদন ছাড়াই অনলাইন কনটেন্ট ব্লক বা অপসারণের ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব উদ্বেগজনক। তাঁর মতে, এর ফলে সাংবাদিক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীরা হয়রানির ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার উপ-প্রেসসচিব অপূর্ব জাহাঙ্গীরও প্রস্তাবিত সংশোধনীর উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। আইনটি বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা বিবেচনার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এনসিপির যুগ্ম আহ্বায়ক সারোয়ার তুষার অভিযোগ করেন, প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে সরকার ডিজিটাল পরিসরে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাইছে। তবে এসব বক্তব্য সভায় অংশগ্রহণকারীদের অভিযোগ ও মতামত; সংশোধনী সম্পর্কে সরকারের বক্তব্য বা ব্যাখ্যা এই প্রতিবেদনে বিস্তারিতভাবে উঠে আসেনি।
বাক্স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার রক্ষার দাবি
সভায় বক্তারা সাইবার অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁদের মতে, আইনটির প্রয়োগ যেন রাজনৈতিক মতভিন্নতা দমনের হাতিয়ার না হয়, সে জন্য অপরাধের সংজ্ঞা স্পষ্ট করা, স্বচ্ছ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা এবং বিচারিক নজরদারি রাখা প্রয়োজন।
আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন এনসিপির কেন্দ্রীয় সংগঠক আরমান হোসাইন। এতে দলের আইন সম্পাদক জহিরুল ইসলাম মুসাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা বক্তব্য দেন।
অনুরূপ সংবাদ
যারা চুরি করে, তাদেরই চোর ধরার দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে: হাসনাত আবদুল্লাহ
ভারতের আন্দোলনকারীদের পাশে নাহিদ ইসলাম, বললেন—‘আমরাও এর মধ্য দিয়ে গিয়েছি’
আলেমদের অন্যের ‘গেমের ঘুঁটি’ না হয়ে নিজস্ব রাজনীতির খেলোয়াড় হতে বললেন হাসনাত