বাজেটে কালো টাকা সাদা করার বিধান, কারা পাবেন এই সুবিধা?
দীর্ঘ বিতর্ক, রাজনৈতিক সমালোচনা ও নানা মহলের আপত্তির পরও ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে অপ্রদর্শিত অর্থ বা ‘কালো টাকা’ বৈধ করার সুযোগ রেখেছে নতুন বিএনপি সরকার। প্রস্তাবিত অর্থবিলে জমি, বিল্ডিং ও ফ্ল্যাট/অ্যাপার্টমেন্ট কেনাবেচার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ করে তা বৈধ করার আইনি বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে এই অর্থের উৎস নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বা অন্য কোনো সংস্থা থেকে কোনো ধরনের প্রশ্ন তোলা যাবে না বলেও আইন সংশোধনের প্রস্তাব আনা হয়েছে।
আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) জাতীয় সংসদে নতুন অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। এর আগে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় সংসদ ভবনে মন্ত্রিসভার বিশেষ বৈঠকে এই বাজেট অনুমোদন দেওয়া হয়। উল্লেখ্য, অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার বিষয়টি অর্থমন্ত্রীর মূল বাজেট বক্তৃতায় সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, বাজেটের অনুষঙ্গ হিসেবে পেশকৃত ‘অর্থবিল ২০২৬’-এ সংশ্লিষ্ট ধারা ও তফসিলে এই বিধান সংযোজন করা হয়েছে।
সুযোগের মেয়াদ ও আইনি সংশোধন
প্রস্তাবিত অর্থবিলের সংশোধনী অনুযায়ী, আগামী ১ জুলাই ২০২৬ থেকে ২০২৭ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত অর্থাৎ আগামী এক বছর জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনা-বেচার ক্ষেত্রে এই অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ পাবেন করদাতারা। এ জন্য ‘আয়কর আইন ২০২৩’-এর প্রথম তফসিলে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
সংশোধিত বিধানে স্পষ্ট বলা হয়েছে:
কোনো করদাতা ব্যক্তি স্বপ্রণোদিতভাবে তাঁর অপ্রদর্শিত অর্থ বিনিয়োগ বা সম্পদ ক্রয়ের তথ্য প্রকাশ করে নির্ধারিত হারে কর পরিশোধ করলে, সেই অর্থের মূল উৎস কিংবা পরিশোধিত কর নিয়ে কোনো কর্তৃপক্ষ কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না এবং কোনো ধরনের শাস্তিমূলক বা আইনি কার্যক্রম গ্রহণ করা যাবে না।
ক্রেতা ও বিক্রেতার জন্য করের হার
-
ক্রেতাদের জন্য: জমি, ভবন বা অ্যাপার্টমেন্ট কেনার ক্ষেত্রে যদি প্রকৃত ক্রয়মূল্য দলিলমূল্যের (Registry Value) চেয়ে বেশি হয়, তবে অতিরিক্ত ওই অংশটিকে অপ্রদর্শিত আয় হিসেবে দেখিয়ে ব্যক্তিশ্রেণির জন্য প্রযোজ্য নিয়মিত আয়কর হারে কর পরিশোধের মাধ্যমে তা বৈধ করা যাবে।
-
বিক্রেতাদের জন্য: কোনো করদাতা যদি জমি বা ফ্ল্যাট বিক্রির ক্ষেত্রে দলিলমূল্যের চেয়ে বেশি টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই অতিরিক্ত অর্থ অপ্রদর্শিত থাকে, তবে তিনি মূলধনী মুনাফার (Capital Gain) জন্য প্রযোজ্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ হারে কর দিয়ে তা সম্পূর্ণ বৈধ করতে পারবেন।
শর্ত ও আইনি বেড়াজাল
এই বিশেষ সুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে কিছু কড়া শর্তও জুড়ে দেওয়া হয়েছে: ১. কোনো ব্যক্তি স্বপ্রণোদিতভাবে অপ্রদর্শিত আয় ঘোষণা করার আগেই যদি তাঁর বিরুদ্ধে আয়কর আইনের আওতায় কোনো অডিট (নিরীক্ষা) বা মামলা বা অন্য কোনো তদন্ত কার্যক্রম শুরু হয়ে থাকে, তবে তিনি অর্থ বৈধ করতে পারবেন ঠিকই, তবে তাঁকে নিয়মিত প্রযোজ্য করের পাশাপাশি অতিরিক্ত আরও ২০ শতাংশ জরিমানা বা কর দিতে হবে। ২. অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার জন্য আয়কর রিটার্নে জীবনযাপন সংশ্লিষ্ট ব্যয়ের বিবরণী (IT-10B) এবং উৎসে কর্তিত বা সংগৃহীত করের তথ্য সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে। ৩. কোনো ব্যক্তি যদি স্বপ্রণোদিতভাবে তথ্য প্রকাশের আগেই দেশের কোনো আদালতে চলমান ফৌজদারি বা কর ফাঁকির মামলায় অভিযুক্ত হন কিংবা কোনো অপরাধে দোষী সাব্যস্ত হন, তবে তিনি কোনোভাবেই এই কালো টাকা সাদা করার সুযোগ পাবেন না।
কালো টাকা সাদা করার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
উল্লেখ্য, গত বছরের অন্তর্বর্তী সরকারের ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটেও প্রথম দিকে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়েছিল। তবে সুশীল সমাজ, অর্থনীতিবিদ ও বিভিন্ন মহলের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরবর্তীতে তা প্রত্যাহার করা হয়। এর আগের আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও একাধিকবার ১৫ শতাংশ বা ফ্ল্যাট রেটে কর দিয়ে কালো টাকা বৈধ করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং সেসব ক্ষেত্রেও ‘অর্থের উৎস নিয়ে প্রশ্ন না তোলার’ বিধান নিয়ে বিএনপি তীব্র সমালোচনা করেছিল। তবে চার মাস আগে নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারও শেষ পর্যন্ত দেশের আবাসন খাত ও অর্থনীতিতে তারল্য প্রবাহ বাড়াতে একই ধরনের সুযোগ পুনর্বহাল করল।
অনুরূপ সংবাদ
বিরোধীদের এলাকায় নারী এমপিদের উন্নয়ন তদারকির দায়িত্ব নিয়ে যে ব্যাখ্যা দিলেন প্রধানমন্ত্রী
‘সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬’ সংশোধন হচ্ছে; মেটাকে ২৪ ঘণ্টায় কনটেন্ট সরাতে বাধ্য করার বিধান যুক্ত করার ঘোষণা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর
ড. ইউনূস ও সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টাসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা