রাজধানীর পল্লবীতে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী আট বছরের শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলায় ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেছেন আদালত। মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা এবং তাকে পালাতে সহযোগিতাকারী তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন—উভয়কেই মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। একই সঙ্গে আসামিদের ৫ লাখ টাকা করে জরিমানা করা হয়েছে।
আজ রোববার (৭ জুন) ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন জনাকীর্ণ আদালতে এই রায় ঘোষণা করেন।
দেশের বিচারিক ইতিহাসে এটিই প্রথম কোনো ধর্ষণ ও হত্যা মামলা, যার বিচারকাজ মাত্র চার দিনে শেষ হলো।
রায়ের পর্যবেক্ষণ ও আদালতের বক্তব্য
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, প্রধান আসামি সোহেল রানা শিশু রামিসাকে হত্যার আগে ধর্ষণ করেছিল—তা চিকিৎসকের প্রতিবেদন ও সাক্ষ্যে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়ার পর সোহেল রানা নিজের জবানবন্দিতে রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার সব অপরাধের দায় স্বীকার করে এবং পরবর্তীতে সেই স্বীকারোক্তি প্রত্যাহারের কোনো আবেদনও করেনি।
অন্যদিকে, তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুন এই নৃশংস অপরাধের কথা জানা সত্ত্বেও স্বামীকে পালিয়ে যেতে সরাসরি সহায়তা করেছে। ফলে আদালত উভয়কেই একই অপরাধে অপরাধী সাব্যস্ত করে সর্বোচ্চ শাস্তির আদেশ দেন।
কঠোর নিরাপত্তা ও চার দিনের বিচারিক প্রক্রিয়া
আজ সকাল থেকেই এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায়কে কেন্দ্র করে আদালত প্রাঙ্গণে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে দুই আসামিকে কড়া পাহারায় আদালতে এনে হাজতখানায় রাখা হয়। রায় ঘোষণার সময় তাঁদের কাঠগড়ায় তোলা হলে অপরাধের বিবরণ শুনে আদালত প্রাঙ্গণে আবেগঘন পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
এর আগে গত ১৯ মে পল্লবী এলাকায় প্রতিবেশী সোহেল রানার বাসা থেকে শিশু রামিসার শিরশ্ছেদ করা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ঘটনার মাত্র ৭ ঘণ্টার মধ্যে দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং দ্রুততম সময়ে অর্থাৎ ৬ দিনের মাথায় আদালতে চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিল করে পুলিশ।
গত ১ জুন মামলার আনুষ্ঠানিক বিচার শুরু হয়। পরদিন ২ জুন রামিসার পরিবার, প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ, চিকিৎসক ও তদন্ত কর্মকর্তাসহ মোট ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্যগ্রহণ করা হয়। গত বৃহস্পতিবার (৪ জুন) রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শুনানি শেষে আদালত আজ ৭ জুন রায় ঘোষণার দিন ধার্য করেছিলেন।
আইনজীবীদের প্রতিক্রিয়া
রায়ের পর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, "আমরা শুরু থেকেই আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পেরেছিলাম। মাত্র চার দিনে এই ঐতিহাসিক রায় দেশের বিচার ব্যবস্থার প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে এবং এটি অপরাধীদের জন্য একটি কঠোর বার্তা।"
অন্যদিকে, আসামিপক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী শুনানিতে সোহেল রানার মৃত্যুদণ্ডের পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের আবেদন করলেও আদালত তা নাকচ করে দেন।
উল্লেখ্য, শিশু রামিসার এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর গত মে মাস জুড়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সুশীল সমাজ, লেখক ও রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে দ্রুত বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানানো হচ্ছিল। মাত্র কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে এই দৃষ্টান্তমূলক রায় আসায় স্বস্তি প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার ও সাধারণ নাগরিক সমাজ।
অনুরূপ সংবাদ
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সীমান্ত মন্তব্য ‘আপত্তিকর ও নতজানু’, প্রত্যাহারের দাবি নাহিদ ইসলামের
স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন আসিফ মাহমুদ
বেগম জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তারের মাস্টারমাইন্ড মতি-মাহফুজ