এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব ও সাবেক সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী গোয়েন্দা জিজ্ঞাসাবাদে চাঞ্চল্যকর তথ্য দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওয়ান-ইলেভেনের সময় বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান এবং আরাফাত রহমান কোকোকে গ্রেপ্তারের পেছনে সেনাবাহিনী নয়, বরং সুশীল সমাজের একটি বড় অংশ এবং প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান ও ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের সরাসরি চাপ ছিল।
গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, পল্টন ও দেলোয়ার হোসেন হত্যা মামলায় দফায় দফায় রিমান্ডে থাকা জেনারেল মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব.) মামুন খালেদকে জিজ্ঞাসাবাদে ওয়ান-ইলেভেনের মূল নেপথ্য কুশীলব হিসেবে এই দুই সম্পাদকের নাম উঠে এসেছে।
গুলশানের সেই নৈশভোজ ও রাজনৈতিক সমীকরণ
জিজ্ঞাসাবাদে জেনারেল মাসুদ জানান, ২০০৬ সালের অক্টোবরে দুই প্রভাবশালী সংবাদপত্রের মালিক এক শিল্পপতির গুলশানের বাসায় তিনি সস্ত্রীক নৈশভোজে যান। সেখানে প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার সম্পাদকসহ দেশের কয়েকজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও বুদ্ধিজীবী উপস্থিত ছিলেন। নৈশভোজের ফাঁকে দুই সম্পাদক ও একজন স্বনামধন্য বুদ্ধিজীবী মাসুদের সঙ্গে একান্ত আলাপে দেশের রাজনৈতিক সংকটে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করেন। মাসুদ তখন তাঁদের সেনাপ্রধান জেনারেল মইন ইউ আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দিলে তাঁরা জানান, সেনাপ্রধানের সঙ্গে অলরেডি কথা হয়েছে।
এরপর ২০০৭ সালের ৮ জানুয়ারি সেনাপ্রধানের সঙ্গে বৈঠকে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সরকারকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয় বলে জানান মাসুদ। তাঁর দাবি, সেনাবাহিনীতে সেনাপ্রধানের চেয়ে তাঁর জনপ্রিয়তা বেশি থাকায় মইন ইউ আহমেদ ওয়ান-ইলেভেনের সময় তাঁকে (মাসুদকে) সামনে রেখে সবকিছু করেছিলেন।
‘বিরাজনীতিকরণ’ ও জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তার
জেনারেল মাসুদের দাবি, সেনাবাহিনী বা কোর কমান্ডারদের বৈঠকে বেগম জিয়া কিংবা তাঁর পরিবারকে গ্রেপ্তার করার কোনো সিদ্ধান্ত ছিল না; বরং তাঁদের গৃহবন্দি বা বিদেশে পাঠানোর আলোচনা ছিল। তিনি দুই সম্পাদককে বলেছিলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের প্রতি সাধারণ সৈনিকদের গভীর শ্রদ্ধা থাকায় জিয়া পরিবারকে গ্রেপ্তার করলে সেনাবাহিনীতে অসন্তোষ তৈরি হতে পারে।
তবে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা ‘মাইনাস টু’ বা দুই নেত্রীকে না সরালে দেশে রাজনৈতিক সংস্কার অসম্ভব বলে চাপ সৃষ্টি করেন এবং এর পক্ষে জনমত তৈরি করতে বলেন। এর পরপরই দুই পত্রিকায় ধারাবাহিক প্রতিবেদন ও মতিউর রহমানের স্বনামে ‘দুই নেত্রীকে সরে দাঁড়াতে হবে’ শিরোনামে কলাম প্রকাশিত হয়, যা মূলত এক-এগারো সরকারের ‘পথ নির্দেশনা’ হিসেবে কাজ করে।
উপদেষ্টা পর্ষদে সুশীল সমাজের আধিপত্য
জিজ্ঞাসাবাদে সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা আরও জানান, ২০০৮ সালের নির্বাচনটি হয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সঙ্গে আওয়ামী লীগের সমঝোতার ভিত্তিতে। ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ১৬ জন উপদেষ্টার মধ্যে ৯ জনই (যার মধ্যে এ বি মির্জ্জা মো. আজিজুল ইসলাম, আইয়ুব কাদরী, ড. ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী, সি এস করিম, এ এম এম শওকত আলী, রাশেদা কে চৌধূরী, ড. হোসেন জিল্লুর রহমান, হাসান আরিফ ও গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী) এই দুই পত্রিকার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বা নিয়মিত কলামলেখক ছিলেন। ২০০৫ সাল থেকেই সুপরিকল্পিতভাবে ‘যোগ্য প্রার্থী’ বাছাইয়ের নামে গোলটেবিল বৈঠক করে রাজনীতিবিদদের প্রতি সাধারণ মানুষের মনে ঘৃণা তৈরি ও ‘বিরাজনীতিকরণ’-এর আবহ তৈরি করা হয়েছিল।
বক্তব্য পাওয়া যায়নি
গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের মতে, ওয়ান-ইলেভেনের পেছনের সম্পূর্ণ রহস্য উদ্ঘাটনে এই দুই সম্পাদককে জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন। তবে এই গুরুতর অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর পক্ষ থেকে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। এমনকি প্রথম আলো কার্যালয়ে প্রতিনিধি পাঠানো হলে জানানো হয়, তিনি অফিসে উপস্থিত নেই।